জাতীয়

বাংলাদেশে হামজনিত মৃত্যু ১,০০০ ছাড়িয়েছে

বাংলাদেশে হামজনিত মৃত্যু ১,০০০ ছাড়িয়েছে

ঢাকা — বাংলাদেশে হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যু ১,০০০ ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS)।

৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল ৮টা পর্যন্ত নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সম্মিলিত সংখ্যা ১,০০২-এ দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ১০০টি মৃত্যু হাম হিসেবে নিশ্চিত হয়েছে এবং ৯০২টি মৃত্যু সন্দেহভাজন হিসেবে রয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে জানানো হয়েছে।

মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে একজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে—৪০৪টি। এরপর রয়েছে সিলেট ১৫৬, রাজশাহী ৯২, ময়মনসিংহ ৭৭, চট্টগ্রাম ৬৫, বরিশাল ৫৭, খুলনা ৩৭ এবং রংপুর ১৪টি।

মার্চ থেকে আক্রান্ত প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাম বা হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে ১,১৮৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর ফলে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজারে পৌঁছেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোট আক্রান্তদের মধ্যে ১,৬৭,৫৮০ জন সন্দেহভাজন এবং ১৯,৯০৪ জনের হাম পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছে।

২০২৬ সালের মার্চে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্নের পর হাম পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটেছিল বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে জরুরি হাম টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। এতে ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

তবে এরপরও হামজনিত মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তি অব্যাহত রয়েছে।

হাম ও ডেঙ্গুতে চাপ বাড়ছে হাসপাতালে

এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১,৪১,৮১৯ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ৫,৫৭৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিল।

একই সময়ে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবও চলছে। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে ৪৫ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলে সরবরাহ করা তথ্যে জানানো হয়েছে।

মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে নয়জনের মৃত্যু এবং ১,৫৭১ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ওই দিনই ডেঙ্গুতে দৈনিক মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির সর্বোচ্চ সংখ্যা ছিল।

ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা বলেন, হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা নির্ধারিত রয়েছে। তবে অতিরিক্ত রোগীর কারণে অনেককে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, “হাসপাতালটি ১,৩৫০ রোগীর জন্য তৈরি হলেও বর্তমানে ২,৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।”

শিশুদের জন্য ব্যবহৃত পেডিয়াট্রিক স্যালাইনের ঘাটতিও চিকিৎসা কার্যক্রমকে জটিল করে তুলছে বলে তিনি জানান।

টিকাদানের ঘাটতিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হাম প্রাদুর্ভাবের পেছনে টিকাদানের অপর্যাপ্ত কভারেজ, টিকা সরবরাহে বিঘ্ন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নীতিগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন।

সরবরাহ করা তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত করা হয় এবং ২০২৫ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বাতিল করা হয়।

এসব কারণে কিছু শিশু হাম সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা নিয়মিত হাম টিকার বয়সে না পৌঁছানোয় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

এপিডেমিওলজিস্ট ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IEDCR) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের টিকাদানের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি।

তিনি বলেন, “২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি।”

বাংলাদেশে এর আগে হাম আক্রান্ত হয়ে এত বেশি শিশুর মৃত্যু দেখা যায়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

১৩ মাস বয়সী ছেলের হাম হওয়ার পর পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী নাসিমা বেগম বলেন, “আমি চাই না অন্য কোনো মা তার সন্তানকে এই রোগে কষ্ট পেতে বা মারা যেতে দেখুক।”

সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, তার ছেলে অসুস্থ থাকায় নির্ধারিত সময়ে টিকা নিতে পারেনি। পরে টিকাদান কেন্দ্রে গেলে পরিবারকে টিকা পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানানো হয়।

জরুরি কর্মসূচিতে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা

জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর থেকে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, তাদের জন্য ক্যাচ-আপ টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

সরবরাহ করা তথ্যে আরও বলা হয়েছে, সব রোগীর হাম পরীক্ষা করা হয় না। ফলে প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

টিকা নেওয়া শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না তা যাচাই করতে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি পূরণ, টিকাদানের কভারেজ বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদান সূচিতে বিঘ্নকে এ অঞ্চলে হাম ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।