তথ্যপ্রযুক্তি

হাইড্রোজেন ট্রেন কী, কীভাবে কাজ করে এবং বিশ্বের কোথায় চলছে?

হাইড্রোজেন ট্রেন কী, কীভাবে কাজ করে এবং বিশ্বের কোথায় চলছে?

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে, ডিজেলচালিত ট্রেনের এক যুগান্তকারী বিকল্প হয়ে উঠেছে হাইড্রোজেন ট্রেন। বিশেষ করে যেসব রেলপথে বিদ্যুতায়ন করা সম্ভব হয়নি, সেখানে এই ট্রেন এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। অত্যাধুনিক ফুয়েল সেল প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী এসব ট্রেন চলাচলের সময় পরিবেশে কেবল জলীয় বাষ্প নির্গত করে, যা একে শতভাগ পরিবেশবান্ধব যানে পরিণত করেছে।

হাইড্রোজেন ট্রেন আসলে কী?

হাইড্রোজেন ট্রেন হলো এমন একটি আধুনিক রেলযান, যা প্রথাগত ডিজেল ইঞ্জিন বা ওভারহেড বৈদ্যুতিক তারের ওপর নির্ভর না করে, হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।

এই ট্রেনের বিশেষায়িত ট্যাংকে উচ্চচাপে হাইড্রোজেন গ্যাস সংরক্ষণ করা হয়। ফুয়েল সেলের ভেতরে বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে সংরক্ষিত হাইড্রোজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো হয়, যার ফলে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। এই উৎপাদিত বিদ্যুৎই ট্রেনের ইলেকট্রিক মোটরকে সচল রাখে।

এই রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে সরাসরি উৎপন্ন হয় কেবল: জলীয় বাষ্প , তাপ

ডিজেল ট্রেনের মতো হাইড্রোজেন ট্রেন চলাচলের সময় কোনো কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2), নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOx) বা ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গত করে না।

কার্যপ্রণালী: কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?

একটি হাইড্রোজেন ট্রেনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চলাচলের প্রক্রিয়া মূলত ৫টি ধাপে সম্পন্ন হয়: সংরক্ষণ: ট্রেনের ছাদে বা নির্দিষ্ট ট্যাংকে উচ্চচাপে হাইড্রোজেন মজুত রাখা হয়।

অক্সিজেন গ্রহণ: ট্রেনটি চারপাশের বাতাস থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে অক্সিজেন গ্রহণ করে। বিক্রিয়া: ফুয়েল সেলের ভেতর হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের সমন্বয় ঘটানো হয়।

বিদ্যুৎ উৎপাদন: এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সরাসরি বিদ্যুৎ শক্তি উৎপন্ন হয়।

সঞ্চালন: উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে ট্রেনের মোটর ঘোরে এবং ট্রেনটি এগিয়ে যায়। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ট্রেনের নিজস্ব ব্যাটারিতে সংরক্ষিত হয়, যা ট্রেনের গতি বাড়ানোর সময় কাজে লাগে।

এছাড়া, আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়ির (EV) মতো হাইড্রোজেন ট্রেনেও রিজেনারেটিভ ব্রেকিং সিস্টেম থাকে, যার ফলে ব্রেক করার সময় উৎপন্ন শক্তি পুনরায় ব্যাটারিতে জমা হয়।

হাইড্রোজেন ট্রেনের কৌশলগত সুবিধা

পরিবেশবান্ধব এই পরিবহন ব্যবস্থার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে: চলাচলের সময় ক্ষতিকর ধোঁয়া বা কার্বন নির্গমন শূন্য (Zero emissions)।

ডিজেল ইঞ্জিনের তুলনায় এটি সম্পূর্ণ শব্দহীন ও মসৃণভাবে চলে।ওভারহেড বৈদ্যুতিক লাইন ছাড়াই দুর্গম ও গ্রামীণ রেলপথে চলাচলে সক্ষম।

পুরো রেলপথ বিদ্যুতায়নের চেয়ে এই ট্রেন দ্রুত ও সহজে মোতায়েন করা যায়।জীবাশ্ম জ্বালানি বা তেলের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্ভরতা ব্যাপকভাবে হ্রাস করে। বর্তমান খাতের চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা

অসংখ্য সুবিধা থাকা সত্ত্বেও, হাইড্রোজেন ট্রেনের ব্যাপক প্রসারে এখনও কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে:

হাইড্রোজেন উৎপাদনের বর্তমান খরচ তুলনামূলকভাবে বেশ চড়া।

নবায়নযোগ্য শক্তি দিয়ে তৈরি 'সবুজ (Green) হাইড্রোজেন'-এর বৈশ্বিক সরবরাহ এখনও সীমিত।যত্রতত্র হাইড্রোজেন রিফুয়েলিং বা গ্যাস ভরার অবকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি।

সাধারণ ডিজেল ইঞ্জিনের চেয়ে ফুয়েল সেল প্রযুক্তির প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় অনেক বেশি।

স্বল্প দূরত্বের রুটে হাইড্রোজেন ট্রেনের চেয়ে ব্যাটারি-চালিত বৈদ্যুতিক ট্রেন বেশি সাশ্রয়ী হতে পারে বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

বৈশ্বিক চিত্র: কোন কোন দেশে চলছে হাইড্রোজেন ট্রেন?

বর্তমানে বিশ্বের বেশ কয়েকটি উন্নত দেশ তাদের পরিবহন ব্যবস্থায় নিয়মিত বা পরীক্ষামূলকভাবে হাইড্রোজেন ট্রেনের ব্যবহার শুরু করেছে:

জার্মানি: বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জার্মানি বাণিজ্যিকভাবে যাত্রীবাহী হাইড্রোজেন ট্রেন চালু করেছে, যা বিদ্যুতায়নহীন আঞ্চলিক রুটে ডিজেল ট্রেনের জায়গা দখল করেছে।

ফ্রান্স: জাতীয় কার্বন নিঃসরণ কমানোর কৌশলের অংশ হিসেবে আঞ্চলিক পর্যায়ে হাইড্রোজেন ট্রেনের ব্যাপক পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালাচ্ছে।

ইতালি: আঞ্চলিক রেল যোগাযোগকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে হাইড্রোজেন রেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

অস্ট্রিয়া: দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে সফলভাবে হাইড্রোজেন ট্রেনের পরীক্ষামূলক পরিচালনা সম্পন্ন করেছে।

চীন: হাইড্রোজেনচালিত আরবান বা নগর রেল প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে এবং উৎপাদন বাড়াচ্ছে।

যুক্তরাজ্য: রেলওয়ে নেটওয়ার্ককে কার্বনমুক্ত করার লক্ষ্যে প্রোটোটাইপ হাইড্রোজেন ট্রেনের পরীক্ষা চালিয়েছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

পরিবহন ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব রেলপথে তার টেনে বিদ্যুতায়ন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল বা প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন, সেখানে হাইড্রোজেন ট্রেন সবচেয়ে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প। তবে এই প্রযুক্তির সফল বিস্তারের জন্য কম খরচে প্রচুর পরিমাণে গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদন, রিফুয়েলিং স্টেশনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ফুয়েল সেল প্রযুক্তিতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

ভবিষ্যতের টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যাটারি-চালিত ট্রেন এবং রেলপথ বিদ্যুতায়নের পাশাপাশি হাইড্রোজেন ট্রেনকেও একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে বিশ্বের নীতি-নির্ধারকেরা।